নারীমুক্তি এবং পরিবার

গ্রাম পরিবার অর্থনীতির বণ্টন ব্যবস্থা থেকে ঔপনিবেশীক যুগে যখন পূঁজিবাদী অর্থনীতিরে মিশ্র রূপান্তর হচ্ছে তখন নারীর ঐতিহাসিক মুক্তির রেখাপাত হিসেবে দেখতে শুরু করেছে নারীবাদী নামের খোলসে মূলত নারীস্বার্থরক্ষাকারীরা। সেই সাথে নারী তার রান্না-বান্না, সন্তান লালন পালন সহ অন্যসব গৃহস্থলী কাজের জন্যে অর্থমূল্য দাবী করে বসে তার নিজের গড়া পরিবারের কাছে। অর্থাৎ নিজের কাছে নিজের দেয়া শ্রমের মূল্য খুঁজতে শুরু করে। অর্থাৎ মুহুর্তেই নিজের স্বামী সংসার হয়ে গেলো একটি ব্যবসায় ঘটনা এবং সেই সাথে সকল ঘটনা হয়ে উঠলো আর্থিক লেলদেনের সওদা-কারবার। কিন্তু নারীবাদ বাস্তবে ঐ ঘটনাগুলোকে কতটুকু আর্থিক মনে করে ঠিক পরিষ্কার না হলেও এটা ঠিক যে হাল আমলে পুরুষের বিপরীতে একটি নারীধারা নির্মানের মধ্য দিয়ে নারী স্বাধীনতার নিশান উড়ানো এটা আমাদের কাছে পরিষ্কার। তাই রোকেয়ার মনোবিকৃত গ্রন্থ ‘সুলতানার স্বপ্ন’ আমাদের অবশ্য পাঠ।
তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের মুসলিম সমাজে তুর্কি কামাল পাশার (ইহুদী প্রশ্নে অনেক মুসলিম এই মানুষটিকে ঘৃনা করে। কিন্তু এই মানুষটি না হলে ভারতে হিন্দুবাদী কংগ্রেসের বিপরীতে মুসলিম লীগ প্রতিষ্টা পেতো না। এবং মুসলিম সমাজে নারীশিক্ষার আমূল পরিবর্তন হতো না।) নারী শিক্ষা বিপ্লবকেও নারীমুক্তির বোধয়ন এর সাথে অনেকে এক করে দেখতে চায়। হাল আমলের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা যেটাকে নারীর ঐতিহাসিক মুক্তির পথ উন্মোচন হিসেবে দেখছি সেটা আসলে নারীর ঐতিহাসিক পরাজয়ের কারণ কিনা তা আমাদের খতিয়ে দেখা জরুরী। যেহেতু নারীশিক্ষায়ন নারী মুক্তির প্রধান অর্থনৈতিক মুক্তি হিসেবে অনেক বাজারি আলোচনা আছে। তবে এটা ঠিক যে চাকরী পাওয়া যায় এমন শিক্ষার বদৌলতে একজন নারী এখন স্বাধীন হয়ে স্ত্রী বা স্পাউস বা ওয়াইফ হিসেবে পরিচিতির চেয়ে আলাদা নারী হিসেবেই নিজেকে দেখতে চায়। এতে করে গ্রাম পরিবার ধারনা থেকেই একজন নারীর নারীস্বত্বার মুক্তি চাইছে নাকি নিজের মুক্তি চাইছে সেটাও আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। আমরা আগেই আলোচনা করেছি যে গ্রাম বাঙলায় পরিবার বলতে কেবল স্ত্রীকেই বুঝায়। যেখানে পরিবার ধারণা একটি যৌততাকেই ইঙ্গিত দেয়। একই সাথে সকল সুপাঠ্যও যৌততারই কথা বলে। এখানে শিক্ষা গ্রহণের সাথে আলাদা স্বত্বা বা নারীস্বত্বা ও মুক্তি নির্মান ধারণা যোগ করাটা অন্যচিন্তার ইঙ্গিত ছাড়া আর কিছু নয়। বাস্তবে প্রকৃত শিক্ষার সাথে এই ধারণার কোন সম্পর্ক নেই।
হাল আমলে নারীদের পণ্য হিসেবে দেখার একটি প্রবণতা আছে গোটা বাজার ব্যবস্থায়। এই পণ্য বাজার ব্যবস্থায় নারীদের নিয়ে আসা সমালোচিত হলে একই সাথে আমাদের ঐ শিক্ষাকেও এক কাতারে দেখতে হবে। কেননা প্রকৃত শিক্ষার সাথে নারীভাবনা যুক্ত নারীমুক্তি যুক্ত কিনা জানা যায় না। তাই নারীকে পণ্য ব্যবসায় বাজারের উপর দোষ চাপানোটা মূলত নিজেকে সেই বাজারি শিক্ষার আলোকে স্বেচ্ছা মুক্তি নিতে চাইছে এমন ভাবনায় দোষ দেখি না। গ্রাম পরিবারে মুক্তি নামের কোন ধারণা নেই। আছে কেবল যৌত সংগ্রাম। যার অপর নাম স্বাধীনতা (ইচ্ছাখুশিকে স্বাধীনতা বলে না) অর্থাৎ একটি পরিবারের স্বনির্ভরতা, ক্ষমতা। যার মূলে আমরা পরিবার নামে একজন নারীকেই দেখতে পাই। এখান থেকেই নারীর ক্ষমতাকে আরও কি ভাবে বাড়ানো সে চিন্তা না করে তুমি আমি সংসারে গিয়ে রোজগেরে স্ত্রীর তার নারীবাদিতার আলাদা ক্ষমতা চাওয়াটা কোন বিশেষ নারীবাদী জাগরণ নয়। এতে বিশৃঙ্খলাই বেড়েছে কেবল। পৃথিবীর কোথাও এই তুমি আমি সংসার ধারণায় শৃঙ্খলা এসেছে এমন প্রমাণ এখনো আমাদের হাতে নেই। তাই পরিবার বলতে দাদা-দাদী, নানা-নানী, চাচা-খালা-ফুপু-মামা ইত্যাদি মিলে নির্মান হলেও ক্ষমতার মূল কিন্তু একজন স্ত্রী। অর্থাৎ একজন নারীই এই পরিবার। এখানেই একজন নারী বিচারকের ভূমিকা পানল করে আসছে বহুদিন ধরে। হোক না সে ভুল বিচার।
শহুরে শিক্ষিতদের পাশাপাশি শহুরে খেটে খাওয়া মানুষদের মধ্যেও কেবল তুমি আমি সংসার করতে বেশী দেখা যায় যা এখনো গ্রাম পরিবার ব্যবস্থায় দেখা যায় না। এর মূলে বাজারি শিক্ষাকেই এককভাবে দায় দেয়া যায় এমন নয়। কিন্তু হাল আমলের বাজারে পণ্য বানাও ঘরানার এই শিক্ষা শহুরে তুমি আমি সংসারে নিয়ে এসেছে এমন ভাবাতে দোষ দেখি না। এতে নারী পণ্য হিসেবে বাজারে বিক্রি বাট্টা অবাক করার বা নারীবাদী স্বার্তে কষ্ট লাগার কথা নয়। কেননা নারীরা এমনটিই অবচেতন মনে চায়নি এই দাবী ভিত্তিহীন নয়। তবে ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। সে ব্যতিক্রম নারীবাদ নয়। একটি কাঠামোগত পরিবার চিন্তার দৃষ্টিকোন থেকে যৌততার প্রশ্নে, নারীপুরুষ মিলে আগামিকে নির্মানের অঙ্গীকার।

আমাদের পরিবার এবং নাগরিক জীবন

Bangladeshপরিবার ধারণায় মার্কসীয় দৃষ্টীভঙ্গী হলো রাষ্ট্রকাঠামোর অর্থনৈতিক উৎপাদনের মৌলিক প্রকৌষ্ট। কোন অনিয়মকে আঘাত করার পুর্ব শর্ত হলো পরিবারকে আগে ভাঙ্গা। যেহেতু ঐ রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান কয়েকটি চালিকার একটি হলো পরিবার। আমার আলোচনা তাত্ত্বিক ঐ ধারণার বিস্তৃতি জুড়ে নয়। বরং একটু গভীরে তার সমস্যাকে খুঁজা।

 

পরিবার ধারণায় গোটা বিশ্বে হাজার হাজার গোত্র জাতির মধ্যে এক একটি দর্শন কাজ করে কিন্তু আমাদের গ্রাম বাঙলায় পরিবার বলতে কেবল স্ত্রীকেই বুঝায়। আমরা নিজের নিক্তিতে মাপা আধুনিকরা এই পরিবার ধারণাকে সেকেলে মনে করে পরিবার নামকে বাদ দিয়ে স্ত্রী বা ওয়াইফ বা স্পাউস নাম বসিয়ে দিয়ে বেশ কেতাদুরুস্থ হয়ে গেছি। কিন্তু আমরা এতটুকুর জন্যেও কি ভেবেছি সেই বহমান প্রাচীন সমাজ কাঠামো থেকে গ্রাম বাঙলায় পরিবার বলতে কেবল স্ত্রীকেই বুজাত? এই তত্ত্বটিই হেনরী লুইস মর্গান তার প্রাচীন সমাজ গ্রন্থে নিয়ে এসেছেন। পরবর্তিতে এঙ্গেলস মার্কসের মত মহীরুহরা সমসাময়িকের সাথে বিশ্লেষণ করেছেন কেবল কিন্তু মূল থেকে সরে গিয়ে কোন আলাদা সত্ত্বা দাড় করান নি। কেবল আমাদের মতন শহুরে নাগর শিক্ষিত ছাড়া। বুজা যায় এটা বুজে যতটা করেছে তার চেয়ে না বুজেছে ঢের।

 

আমাদের প্রাচীন গ্রাম নির্ভর পরিবার অর্থনীতিতে (মুখ্যত নিজের প্রয়োজনে উৎপাদন) যখন শহুরে স্বামী-স্ত্রী নির্ভর তুমি আমি অর্থনীতিতে (মুখ্যত অন্যের প্রয়োজনে উৎপাদন) রূপান্তর হচ্ছে তখন পূঁজির বিকাশ না হয়ে হয়েছে ব্যক্তিমালিকানাধীন পূঁজির উৎপত্তি। ফলে দেখা দিয়েছে পূঁজি বিকাশ এবং ব্যক্তি পূঁজি পুঞ্জির মধ্যকার দ্বন্ধ। এই দ্বন্ধে প্রথম বলী হলো আমাদের মধ্যে শহুরে নাগর শিক্ষিত। ফলে তাদের চরিত্রে দেখা দিলো হাজার রকমের কিসসা, প্রবন্ধ এবং নিবন্ধ। তাই কেউ তাদের বিশ্বাস করতে চায় না। তাই তাদের দরকার পড়ে অমুক বিদ্যাপীঠের কাগজ, অমুক ব্যক্তির দেয়া টু হুম ইট মে কনসার্ণ এবং তমুক ব্যক্তির পরিচয়। তাই সমাজে অবিশ্বাস অনাস্থা এবং অসততা এতটাই বেড়ে যাচ্ছে যে স্বয়ং অধুনিক অর্থনীতির পুরুধা স্যমুয়েল-পিগুদের নয়া অর্থনীতিবাদ কেবল ব্যক্তিমালিকানাধীন পূঁজি বৃক্ষের তলায় তেল-পানি-সার দিয়ে যাচ্ছে।

 

আজ থেকে ২০ বছর আগেও ঢালাও ভাবে স্বামীরা তাদের সন্তানের মাতাকে পরিবার বলতো। এখনো আমাদের কিছু কিছু কৃষীনির্ভর গ্রামে গঞ্জে এই পরিবার ধারণার চল আছে। একটি পরিবার কেবল একটি নারীকে ঘিরেই এবং তার সাথে অর্থনৈতিক বিলিবণ্টন ব্যবস্থাও ন্যাস্থ থাকতো ঐ নারীর হাতেই। কোন ছেলে কি পাবে, কত পাবে, কেমন পাবে, কোন নাতি কি পাবে কেমন পাবে এসব সিদ্ধান্ত আমরা নারীদেরকেই করতে দেখে এসেছি। অর্থাৎ পরিবার হলো অর্থনৈতিক কাঠামোর ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে একজন নারীকেই দেখে আসছি, সে নারী মা ও হতে পারে আবার দাদীও হতে পারে। এখানে একজন নারীই মূল চালক। (আমার মাকে আমি এভাবেই দেখে আসছি। এমনকি আমার দাদীকেও এ ভাবে দেখেছি।)।

 

এখন নারী স্বাধীনতা, নারী শিক্ষা, নারীর আত্বনির্ভরশীলতা নিয়ে যে সব বাজারি আলাপ দেখতে পাই তাতে কেবল একটি নারীকে স্ত্রী কিংবা স্পাউস বা ওয়াইফ হিসেবেই প্রচলিত ধারণা প্রতিষ্টা পেয়েছে। কিন্তু আমরা এখানে কোন পরিবার খুঁজে পাই না। স্বামী-স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পরিবার ধারণা একটি বিচ্ছিন্ন ধারণা বরং সব মিলেই পরিবার ধারনাটাই একটি বিস্তৃতি ধারণা। এতে আছে হাজার সংগ্রাম, দুঃখ-আনন্দ, উৎসব-উল্লাস, বিশ্বাস-আস্থা এবং অবিশ্বাস। তবে সবটাই এখানে যৌততার সংগ্রাম। এখানে নেই কোন ব্যক্তি আলাদা স্বত্বা। এই ব্যক্তি আলাদা স্বত্বাকে নির্মান করতে গিয়ে আমরা একক ভাবে তুমি আমি পরিবার ধারণায় এসে দীর্ঘ স্বাস ফেলছি। যেহেতু এর পরের সংগ্রাম কি ভাবে মোকাবেলা করতে হবে তার কোন বাস্তব ধারণা আমাদের নেই।

 

অতীতে একটি পরিবারকে টিকে রাখতে বিবাহের প্রাতিষ্টানীক বুঝাপড়ার দরকার পড়তো না। নিজদের বুঝাপড়ার মধ্যদিয়ে একটি বিবাহকে স্থায়ীত্ব দিতো। মুহূর্তেই অবিশ্বাস জন্মাতো না। শত দুখ-কষ্টেও পরিবারকে ধরে রাখতে তাদের নিজেদের বিশ্বাস আস্থায় ছিড় ধরতো না। চরম দূরদিনেও সে সব পরিবার যৌত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরিবারকে ধরে রাখতে মরিয়া যুদ্ধ করতো। এখন আমাদের এই তুমি আমি পরিবার ধারণায় এসবের দরকার পড়ে না। তাই আমরা ধৈর্য হারিয়ে ফেলি, সংগ্রামের মনোবল নড়বড়ে হয়ে পড়ে কেনা এখানে সবাই নাকি মুক্ত এবং স্বাধীন। আলাদা স্বত্বা।

 

পৃতিবীর কোন পাঠ আমাদেরকে শিক্ষা দিচ্ছে, আমার আলাদা মুক্ত স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন ব্যক্তি? পৃতিবীর কোন পাঠ বলছে পড়ালেখা করলে কেবল চাকরীই করতে হবে? কোন পাঠ বলছে তুমি আমি ছাড়া আমাদের আর কোন অংশীদার নেই? পৃতিবীর কোন পাঠ বলছে রান্না বান্না করলে স্বামী সংসার করা যাবে না? অথবা কোন পাঠ বলছে নারীরা কেবল ঘরেই থাকবে? কোন পাঠ বলছে পুরুষ গৃহিনী চাইছে আর নারী চাইছে একটি স্বামী? সকল পাঠই তো চাইছে যৌত অংশীদার। নির্ভরতা, আস্থা এবং বিশ্বাস।

 

আমাদের গ্রাম্য পরিবার ধারণায় আমরা ঐ সব ইচ্ছাখুসি নির্মান দেখতে পাই না। পরিবার যা করছে তার ভুলগুলো সুশিক্ষার আলোকে ঠিক করে একটি নতুন সমসাময়িক পরিবার নির্মান করাটাই আমাদের এই যৌত সংগ্রাম। বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে পরিবার নির্মান হয় না। হয় তুমি আমি সং-এর-সার। তাই শহুরে নাগর দাম্পত্যের বিচ্ছেদ গ্রাম থেকে উল্লেখ করার মতনই বেশী।

%d bloggers like this: